এক নজরে প্রকৃতিকন্যা তাহিরপুর

হাওর আর সীমান্ত ঘেঁষা জনপদ সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা। আছে লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য। খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত লাউড়ের পাহাড়ের নামানুসারে তাহিরপুর উপজেলায় পৌরাণিক যুগের লাউড় রাজ্যে কালের সাক্ষী। সব মিলিয়ে পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় এ উপজেলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর টুরিস্ট পুলিশ সহায়তায় এ উপজেলা হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ তথা বিশ্বের মানুষের কাছে পর্যটন নগরী হিসেবে প্রিয় একটি নাম।

হাওরের রাজধানী হিসেবেও খ্যাত সুনামগঞ্জের এই তাহিরপুর উপজেলাটি প্রাকৃতিক সম্পদ আর সৌন্দর্যের ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ। প্রকৃতি যেন তার অকৃপণ হাতে সাজিয়ে দিয়েছে তাকে। এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এ অঞ্চলে প্রকৃতি প্রেমী আর ভ্রমণপিয়াসীদের আগমন।

প্রযুক্তি আর যান্ত্রিকতার এ যুগে গতানুগতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে তার আপন সৌন্দর্য উপভোগ করার আয়েসে ঘুরে আসেন প্রকৃতির আর সৌন্দর্যের রাণী তাহিরপুর থেকে। প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যরে ভাণ্ডার তাহিরপুরের এসব দর্শনীয় স্থান দেখতে প্রতিবছরই দেশি -বিদেশি পর্যটক, ভ্রমণ পিপাসীদের আগমন ঘটে এ হাওর-সীমান্ত জনপদে। ছুটির দিন ছাড়াও প্রতিদিন-ই পর্যটক দর্শনার্থীদের আগমন নিত্য নৈমিত্তিকে পরিণত হয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে বিভিন্ন স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পিকনিক স্পট হিসেবে তাহিরপুর দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতারাও শ্যুটিং স্পট হিসেবে বেছে নিচ্ছেন তাহিরপুরকে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সম্পদের ভাণ্ডার তাহিরপুরের অন্যতম পর্যটন স্পট গুলো হলো, টাঙ্গুয়ার হাওড়, বারেক টিলা, যাদুকাটা নদী, নীলাদ্রি (শহীদ সিরাজ লেক) জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান, হাওলি জমিদার বাড়ি, বিকি বিল।

টাঙ্গুয়ার হাওর: সমুদ্র সাদৃশ্য বিশাল জলরাশির টাঙ্গুয়ার হাওড় দেশের অন্যতম রামসার সাইট। টাঙ্গুয়ার হাওরের বিস্তৃতি ধর্মপাশা ও তাহিরপুরের দশটি মৌজা নিয়ে। ছোট-বড় ১২০ টি বিল নিয়ে এ হাওর দুই উপজেলার ৪৬টি গ্রামসহ পুরো টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকার আয়তন প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে ২ লক্ষ ৮০ হাজার ২৩৬ হেক্টরই জলাভূমি।

বর্ষা মৌসুমে পুরো হাওর-ই পানির নিচে তলিয়ে যায়, শীত মৌসুমে শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচার জন্য সুদূর সাইবেরিয়া সহ বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে অতিথি পাখি ছুটে আসে এ হাওরে। পরিযায়ী পাখির অন্যতম আশ্রম বলা হয় এ টাঙ্গুয়ার হাওড়কে। প্রায় ২০৮ প্রজাতির পাখি, ১৫০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ ও ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণীর আবাসস্থল এই টাঙ্গুয়ার হাওর। প্রতি বছর শুধু শীতকালেই পৃথিবীর বিভিন্ন শীত প্রধান দেশ থেকে আরো প্রায় ২০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখিরা এ হাওরকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নেয়।
টাঙ্গুয়ার হাওরে আছে ১৪০ প্রজাতিরও বেশি স্বাদু পানির মাছ।

বারেকের টিলা: তাহিরপুরের আরেক দর্শনীয় স্থান হলো বারেকের টিলা, স্থানীয়রা যাকে বারিক্কার টিলা বলে ডাকে। এছাড়াও একে বাংলার আইফেল টাওয়ার হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এ টিলার তলদেশ দিয়েই বয়ে গেছে রূপের নদী যাদুকাটা। নীল আকাশের সাদা মেঘ টিলাকে যেন ছুঁয়ে যায় এ এক অন্যান্য মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপটের অবতারণা হয়। প্রতিদিন-ই বারেকের টিলায় পর্যটক দর্শনার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যাদুকাটা নদী: রূপের আর স্বচ্ছ নীলাভ পানির যাদুকাটা নদী ভারতের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় হতে উৎপত্তি। এ যাদুকাটা নদীকে কেন্দ্র করে উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার প্রায় ২০-২৫ হাজার শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস হিসেবে গড়ে উঠেছে। যাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ নীলাভ স্রোতের ধারা আর পানির নিচে চিকচিক সাদা নুড়িপাথর যে কাউকেই বিমোহিত করবে।

জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান: তাহিরপুরের উপজেলার যাদুকাটা নদীর নিকটবর্তী মানিগাঁও গ্রামে প্রায় ১০০ বিঘারও বেশি জায়গা জুড়ে গড়ে উঠা শিমুল গাছের দেশের বৃহৎ শিমুল বাগান। বাগানের নদীর ওপারে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ের, মাঝে মায়ার নদী যাদুকাটা। ২০০২ সালে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মানিগাঁও গ্রামের যাদুকাটা নদী সংলগ্ন লাউড়ের গড়ে বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন নিজের প্রায় ২ হাজার ৪০০ শতক জমিতে সৌখিনতার বসে শিমুল গাছ রোপণের উদ্যোগ নেন। দিনে দিনে বেড়ে ওঠা শিমুল গাছগুলো এখন হয়ে উঠেছে শিমুল বাগান। বাগানের সঙ্গে লেবুর বাগানও গড়ে উঠেছে।বসন্ত এলে দুহাজার শিমুল গাছ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। ফাগুনের অরুণ আলোয় ফোটে বাগানের শিমুল ফুলগুলো। চোখের তৃষ্ণা মেটাতে টাঙ্গুয়ার হাওর, মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে ও রূপের নদী যাদুকাটার মধ্যস্থলের বিশাল শিমুল বাগানে ফুটে ওঠা টুকটুকে লাল শিমুল ফুলগুলো দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন শত শত পর্যটক। বসন্তের দুপুরে পাপড়ি মেলে থাকা শিমুলের রক্তিম আভা মন রাঙায় তো বটেই, ঘুম ভাঙায় সৌখিন হৃদয়ের। এ যেনো কল্পনার রঙে সাজানো এক শিমুলের প্রান্তর। ওপারে ভারতের মেঘালয় পাহাড়, মাঝে যাদুকাটা নদী আর এপাড়ে শিমুল বন। সব মিলে মিশে গড়ে তুলেছে প্রকৃতির এক অনবদ্য কাব্য। যে কাব্যের পরতে পরতে কেবল লালের সমারোহ।

হাওলি জমিদার বাড়ি: হাওলি জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে অবস্থিত একটি প্রাচীন ব্যবস্থাপনা তথা পর্যটন স্পট হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। এটি ৯ম শতকে প্রাচীন লাউঢ় রাজ্যের রাজপ্রসাদ হিসাবে ব্যবহার করার জন্য রাজা বিজয় সিংহ কর্তৃক নির্মিত হয়। তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের হলহলিয়া গ্রামটি এক কালে প্রাচীন লাউড় রাজ্যের রাজধানী ছিল। লাউড় রাজ্যের চতুসীমা ছিল পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র নদ, পূর্বে জৈন্তায়া, উত্তরে কামরুপ সীমান্ত ও দক্ষিণে বর্তমানে ব্রাহ্মনবাড়িয়া পর্যন্ত। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই লাউড় রাজ্যের প্রাচীন নিদর্শন হাওলি জমিদার বাড়িটি প্রকৃতপক্ষে ছিলো রাজবাড়ি। রাজা বিজয় সিংহ আজ থেকে প্রায় ১২’শ বছর পূর্বে এই বাড়িটি তৈরি করেন। রাজবাড়িটি ৩০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তৎকালে নির্মিত এই রাজ বাড়িটিতে ছিল বন্দীশালা, সিংহদ্বার, নাচঘর, দরবার হল, পুকুর ও সীমানা প্রাচীর যার কিয়দংশ আজ ১২শ বছর পরেও দৃশ্যমান রয়েছে। সম্প্রতি একে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি সরকারি তালিকাভুক্তও হয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর এই প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনাকে সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়।

বিকি বিল (লাল শাপলার গ্রাম): সম্প্রতি তাহিরপুরের আরেক চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের দেখা মিলে উপজেলার বাদাঘাট বাজার থেকে বড়ছড়া-চারাগাঁও শুল্কস্টেশন এলাকায় যেতে কাশতাল গ্রামের পাশে। বিকি বিল, স্থানীয়রা যাকে লাল শাপলার গ্রাম হিসেবে অভিহিত করেছে। শত-শত, হাজারো লাল শাপলা ফুটে রক্তিম আভার সৃষ্টি করে।

যে দিকে চোখ যায় শুধু লাল শাপলা। যেন লাল শাপলার মেলা বিলজুড়ে। পাহাড়ের কাছে হাওরের এমন সৌন্দর্য স্থানীয়দের তো বটেই, মুগ্ধ করছে বিভিন্নস্থান থেকে আসা লোকজনকেও। এই বিলে এখন এখন তাকালে মনে হবে লাল গালিচা বিছানো।চাষাবাদ ছাড়াই হাওরে ফুটেছে এই লাল শাপলা।

জানা গেছে, বড়দল (উ:) ইউনিয়নে অবস্থিত বিকিবিলটি হলহলিয়ার ও দিঘলবাঁক মৌজার প্রায় ১৪.৯৫ একর জায়গা নিয়ে বিস্তৃতি। কাশতাল, বোরোখাড়া ও আমবাড়ি এ তিনটি গ্রাম বিকি বিলটিকে তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছে যার পাশেই মেঘালয়ের সীমান্ত অবস্থিত। কোন রকম চাষাবাদ ছাড়াই ১৫-১৬ বছর যাবত প্রাকৃতিক ভাবে এই বিলে লাল শাপলা ফুলের বিপুল সমারোহ ঘটে। বছরের ছয় মাস এই বিলে পানি থাকে বিধায় ছয় মাসই লাল শাপলার এই অপরূপ দৃশ্য যে কেউ উপভোগ করতে পারেন। ভোর থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত ফুটে থাকা শাপলাগুলো সবুজের মধ্যে লাল চাদরে ঢেকে রাখে যা এখানে ঘুরতে আসা ভ্রমণ পিয়াসিদের ভ্রমণের আনন্দে নতুন মাত্রা তৈরি করে। আগস্ট থেকে নভেম্বর-এই চারমাস মূলত লাল শাপলা থাকে।

 

এছাড়াও এ উপজেলায় আরো বেশ কয়েকটি পর্যটন স্পট রয়েছে যেখানে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে প্রতিটি দিন। এগুলো হলো- মেঘালয় পাহাড় ঘেঁষা হযরত শাহ আরেফিন (রহ:) এর আস্থনা, রাজারগাঁও অদ্বৈত প্রভুর আশ্রম, গড়কাটি ইসকন মন্দির, কড়ইগড়া-রাজাই আদিবাসী পল্লী, রাজাই টিলা, রাজাই ঝর্ণা ধারা, টেকেরঘাটের বড়ছড়া শুল্ক ষ্টেশন, বড়ছড়া বীর শহীদদের বধ্যভূমি, টেকেরঘাটের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প, শহীদ সিরাজ বীর উত্তমের সমাধীস্থল, লাকমা ছড়া, লালঘাট ছড়া, লালঘাট ঝর্ণা, চারাগাঁও শুল্কষ্টেশন, বাগলী শুল্ক ষ্টেশনসহ নানা দর্শনীয় স্থানগুলো।

স্থানীয়রা এ প্রতিবেদককে জানান, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলাটি প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ একই সাথে সৌন্দর্য্যেরও ভাণ্ডার। দিন দিন এ অঞ্চলে পর্যটকদের আগমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু সেই অনুসারে পর্যটন স্পট গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন নেই বললেই চলে। নিরাপত্তার দিকটাও ভাবাচ্ছে দিনকি দিন। বিশেষ করে হাওরে, নীলাদ্রীতে বা বারেকের টিলায় পর্যটকদের রাতের অবস্থানে ঝুঁকি রয়ে যায়। কারন এখনো তাহিরপুরের পর্যটন স্পটগুলোতে আলাদা করে টুরিস্ট পুলিশ নিয়োগ করা হয়নি। স্থানীয় প্রশাসনকে ছুটির দিনগুলোতে, ঈদে বা পূজার ছুটিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা প্রদানে হিমসিম খেতে হয়।

তাহিরপুরে পর্যটন শিল্পের প্রসার ও বিকশিত করার লক্ষ্যে কি কি পদক্ষেপ বর্তমান সময়ে নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজেন ব্যানার্জি বলেন, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের উদ্যোগে ট্যাকেরঘাটে একটি রিসোর্ট কাম হোটেল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ অর্থ বছরেই এ কাজের জন্য জন্য বাজেট বরাদ্দ হবে। আর এ অঞ্চলের পর্যটন স্পট গুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তাছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তার দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তার জন্য টুরিস্ট পুলিশ জরুরি বিষয় হয়ে উঠেছে, এ ব্যাপারে আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট তাহিরপুরে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য টুরিস্ট পুলিশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবো।

উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের নভেম্বরে তাহিরপুরে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় টাংগুয়ার হাওর, বারেক টিলা, ট্যাকেরঘাটসহ এ অঞ্চলে পর্যটনশিল্প গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। স্থানীয়রা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির প্রতিও কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

শেয়ার করুন:

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on whatsapp
Share on email
Share on print

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ